Friday, July 22, 2011

মাত্র ৬ হাজার টাকায় সন্তান বিক্রি



বগুড়া, ২২ জুলাই (শীর্ষ নিউজ ডটকম): বগুড়ায় অভাবের তাড়নায় মাত্র ৬ হাজার টাকায় ১২ দিনের ফুটফুটে পুত্র সন্তানকে বিক্রি করলেন জন্মদাত্রী মা। বগুড়া শহরতলীর পালশা আর্দশ গুচ্ছ গ্রামের বাসিন্দা দিনমজুর মোকছেদ বৃহস্পতিবার সন্তানটি কিনে নেন। পুত্র সন্তানের আকাঙ্খা পূরণের জন্য ১২ দিন বয়সী এ সন্তানটি কিনে নেন তিনি। এখন থেকে এই সন্তানটি মোকছেদের ঘরেই বড় হবে। ভবিষ্যতে তার জন্মদাত্রী মা কোনো দাবি করতে পারবে না মর্মে স্ট্যাম্পে লিখিত চুক্তিও করেছেন দিনমজুর মোকছেদ।
জানা গেছে, বগুড়ার ট্রাক চালক এমদাদুল যশোরে ট্রাক নিয়ে গেলে সেখানে পরিচয় হয় নুপুর (২০) নামের এক মেয়ের সঙ্গে। পরবর্তীতে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করতে গিয়ে একে অপরের প্রেমে পড়ে যান তারা। কিন্তু এমদাদের প্রতারণার ফাঁদে আটকা পড়ে যায় নুপুর। প্রতারক এমদাদুল তার স্ত্রী-সন্তান থাকা স্বত্ত্বেও মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে নুপুরকে বিয়ের কথা বলে গভীর সর্ম্পক গড়ে তোলে। একপর্যায় নুপুরকে বিয়ে করে বগুড়ায় নিয়ে আসে ট্রাক চালক এমদাদুল।
এদিকে বাবা-মা'র নিষেধ উপেক্ষা করে বগুড়ার অপরিচিত ছেলেকে বিয়ে করায় নুপুরের সঙ্গে সর্ম্পক ছিন্ন করে তার পরিবার। এমদাদুল নুপুরকে বগুড়ায় নিয়ে এসে শহরের নাটাইপাড়ার (বউ বাজার) একটি বাড়িতে ঘর ভাড়া নিয়ে বসবাস শুরু করে। কিন্তু অল্প দিনের মধ্যেই ফাঁস হয়ে পড়ে এমদাদুলের প্রতারণার বিষয়টি। নুপুর জেনে যায় এমদাদুলের আরেক স্ত্রী এবং সন্তানের কথা। এনিয়ে দু'জনের মধ্যে দেখা দেয় মনমালিন্য। এরইমধ্যে নুপুর অন্তঃস্বত্ত্বা হয়ে পড়ে। এর কিছুদিন পর এমদাদুল নুপুরের কাছে যাতায়াত বন্ধ করে দেয়। এক সময়ের প্রাণপ্রিয় মানুষটি কোনো খোঁজ খবর না নেয়ায় মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ে নুপুরের। ধীরে ধীরে গর্ভের সন্তানও বড় হতে থাকে। পেটে সন্তান নিয়ে নপুর শহরের বিভিন্ন স্থানে হন্য হয়ে খুঁজে বেড়ায় প্রতারক স্বামী এমদাদুলকে। কিন্তু এমদাদুলের সঠিক কোনো ঠিকানা না থাকায় সে কোথাও দেখা পায়না তার। শেষপর্যন্ত মানুষের বাড়িতে ঝি'য়ের কাজ নিয়ে গর্ভের সন্তানকে বড় করে তোলে নুপুর। এভাবে কেটে যায় আরও ৭/৮ মাস।
বাচ্চা প্রসবের সময়ে বাড়ির মালিক প্রয়োজনীয় ওষুধ এবং খাবার কিনে দিয়ে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন। ১০ জুলাই ভাড়া বাড়িতেই নুপুর প্রসব করে ফুটফুটে এক পুত্র সন্তান। সন্তান জন্ম দিয়ে খুশি হওয়ার বদলে বরং আরও দিশেহারা হয়ে পড়ে নুপুর। সন্তান লালন পালন করবে না কি নিজের খাবার যোগাড় করবে এ নিয়ে সে দুশ্চিন্তায় পড়ে যায়। বাড়ির মালিকের ঘরেই খাওয়া-দাওয়া চলে কয়েক দিন। কিন্তু এভাবে আর কতদিন? বাড়ি মালিকের আয়ও সীমিত। তাই অভাব অনটনে পড়ে বাধ্য হয়ে সন্তান বিক্রির সিদ্ধান্ত নেয় নুপুর। বাড়ির মালিকের সহযোগিতায় খুঁজে পায় পুত্র সন্তানহীন দিন মজুর মোকছেদকে। আলাপ আলোচনা চূড়ান্ত করে বুধবার সন্ধ্যায় আদরের সন্তানকে নিয়ে যায় মোকছেদের বাড়িতে। সেখানে রাতযাপনের পর বৃহস্পতিবার ৬ হাজার টাকার বিনিময়ে আদরের সন্তানকে তুলে দেয় মোকছেদের স্ত্রীর কোলে। ভবিষ্যতে আর যেন সন্তানের দাবি করতে না পারে এজন্য গুচ্ছ গ্রামের লোকজনের উপস্থিতিতে নুপুরের সঙ্গে স্ট্যাম্পে লিখিত চুক্তি করে দিনমজুর মোকছেদ।
বৃহস্পতিবার পালশা গুচ্ছগ্রামে গিয়ে দেখা পাওয়া যায় মোকছেদের স্ত্রীর। সন্তান কেনার কথা জিজ্ঞেস করতেই কাপড়ে মুখ ঢেকে চলে যায় অন্য দিকে। এরপর মুহূর্তের মধ্যে সন্তানটিকে সরিয়ে রাখে অন্যত্র। সাংবাদিক এসেছে শুনে অনেক নারী পুরুষ জমে যায় সেখানে।
গুচ্ছ গ্রামের বাসিন্দারা বলেন, এই শহরে অনেক বড় লোক থাকলেও কেউ এগিয়ে আসেনি নুপুরের পাশে। কিন্তু দিনমজুর মোকছেদ সন্তানটি কিনে নেয়ায় তাকে যেন ঝামেলায় পড়তে না হয়, কোনো আইন যেন তার সন্তানকে কেড়ে না নেয় এই দাবি সকলের। মোকছেদের স্ত্রী নিজের নাম বলতে অস্বীকার করে বলেন, ছেলের আশায় আশায় আমার ঘরে এখন ৪টি মেয়ে। তাই পালন করার জন্য নিয়েছি এই ছেলে সন্তানকে। টাকা দেয়ার ব্যাপারে তিনি বলেন ওই মহিলা অভাবে পড়েই আমার কাছে সন্তান নিয়ে এসেছে। তার খরচের জন্য ৬ হাজার টাকা দিয়েছি।
স্ট্যাম্পে লিখিত নেয়ার ব্যাপারে তিনি বলেন, আমার অভাব অনটনের সংসারে এই সন্তানকে কষ্ট করে বড় করার পর যেন তার মা কোনো দাবি করতে না পারে সেজন্যই লিখিত নেয়া হয়েছে।
(শীর্ষ নিউজ ডটকম/প্রতিনিধি/মাবি/৪.১৪ঘ.)

No comments:

Post a Comment