Saturday, July 23, 2011

ভোটযুদ্ধের আগেই জোটযুদ্ধ

  সোহেল হায়দার চৌধুরী:  ভোটযুদ্ধের আড়াই বছর আগেই জোটযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। এ যুদ্ধে স্ব-স্ব শিবিরের নেতৃত্ব দিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিরোধীদলীয় নেত্রী খালেদা জিয়া। এরই অংশ হিসেবে দেশের দুই প্রধান রাজনৈতিক শক্তি আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি ছোট ছোট রাজনৈতিক দল ও সমমনাদের কাছে টানা এবং বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন, ব্যক্তিত্ব ও গণমাধ্যম প্রতিনিধির সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে। এছাড়া দল দুটি তাদের জোটে থাকা মিত্রদের সঙ্গেও দূরত্ব কমিয়ে আনারও পদক্ষেপ নিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এরই মধ্যে ক্ষমতাসীন মহাজোটের ঐক্য ধরে রাখার পাশাপাশি সিপিবি, বাসদ, এলডিপি, কৃষক-শ্রমিক জনতা লীগ, বিকল্পধারা, আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর জাতীয় পার্টি এবং জাসদসহ বেশ কয়েকটি দলকে জোটে আনার চেষ্টা করছে আওয়ামী লীগ। এছাড়া মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের এবং সমমনা অন্যান্য দলের সঙ্গেও তারা পর্যায়ক্রমে যোগাযোগ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। একই সঙ্গে মহাজোটের শরিক দলগুলোর সঙ্গে যে দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে, তাও কমিয়ে আনতে চায় আওয়ামী লীগ। এ নিয়ে ইতোমধ্যেই তাদের ১৪ দলের শরিক জাসদ, ওয়ার্কার্স পার্টি, ন্যাপ এবং গণতন্ত্রী পার্টির নেতাদের সঙ্গে কথা হয়েছে। গণতন্ত্রী পার্টির নেতা মোহাম্মদ নূরুল ইসলাম হত্যাকা-ের বিচারের দাবিতে অনুষ্ঠিত মানববন্ধনে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের অংশগ্রহণও এ প্রক্রিয়ারই অংশ বলে জানা গেছে।
এদিকে বিএনপির নেতৃত্বে জোট বিস্তৃত করার কর্মপ্রক্রিয়াও এগিয়ে চলেছে জোরেশোরে। দলটির শীর্ষ নেতারা এরই মধ্যে বিকল্পধারা প্রধান অধ্যাপক ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী, এলডিপি প্রধান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ এবং কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ প্রধান বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর সঙ্গে বৈঠক করেছেন। এছাড়া তারা জাসদের একাংশের প্রধান আ স ম আবদুর রব, কল্যাণ পার্টির প্রধান মেজর জেনারেল (অব.) ইব্রাহিম এবং পিডিপি প্রধান ফেরদৌস আহমদ কোরেশীর সঙ্গেও কথা বলেছেন। এর আগে বিএনপি সমমনা এনডিপি, জাগপা, ইসলামী ঐক্যজোটের একাংশ, বাংলাদেশ মুসলিম লীগ, বাংলাদেশ ন্যাপ এবং ভাসানী ন্যাপসহ বেশ কয়েকটি দলের সঙ্গে গাঁটছাড়া বেড়েছে। নতুন জোটযুদ্ধ সম্পর্কে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফ জানান, মহাজোটের ঐক্য ও পরিধি আরো বাড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। বাস্তবতার কারণে মহাজোটে কিছুটা দূরত্ব সৃষ্টি হলেও আদর্শ ও চেতনার দিক দিয়ে জোটের দলগুলো বরাবরই পরস্পরের মিত্র। সেই মিত্রতা আরো গভীর করার জন্য তাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা চলছে।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর যায়যায়দিনকে জানান, বিকল্পধারা এবং এলডিপিসহ সমমনা বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে তাদের আলোচনা অব্যাহত থাকবে। আলোচনা হবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী কিন্তু আওয়ামী লীগের ওপর আস্থাশীল নয়, এমন সংগঠনগুলোর সঙ্গেও। তবে ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করছে জোটের সম্প্রসারণ বা কর্মসূচির ক্ষেত্রে অন্যদের একাত্মতার বিষয়টি। দেশের সুশীল সমাজের সঙ্গেও মতবিনিময়ের বিষয়টি বিএনপির বিবেচনায় রয়েছে।
জানা গেছে, বিগত নির্বাচনে শতকরা ৪৯ শতাংশ ভোট পেয়ে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার গঠন করে। অন্যদিকে ৩৩ দশমিক ২ ভাগ ভোট পেয়ে ভরাডুবি হয় বিএনপির। ভোটের অঙ্কে ২০০৮ সালের নির্বাচনে ৪৬টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে শতকরা ৭ ভাগ ভোট পেয়ে ২৭টি আসনে জয়লাভ করে এরশাদের জাতীয় পার্টি। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী ৩৯টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ৪ দশমিক শূন্য ৬ ভাগ ভোট পেয়ে ২টি আসন লাভ করে। ২০০১ সালের নির্বাচনে জাতীয় পার্টি ২৮০টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে শতকরা ৭ দশমিক ২২ ভাগ ভোট পেয়ে আসন পায় ১৪টি। একই নির্বাচনে জামায়াত ৩১টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ৪ দশমিক ২৮ ভাগ ভোট পেলেও আসন পায় ১৭টি।
এসব কারণে ভোট ও জোটের অঙ্কে আওয়ামী লীগের কাছে জাতীয় পার্টি এবং বিএনপির কাছে জামায়াতের গুরুত্ব অপরিসীম। তাই এরশাদকে জোটে ধরে রাখতে যতটা মরিয়া আওয়ামী লীগ, ঠিক ততটাই জামায়াতের ক্ষেত্রেও বিএনপি। বিএনপির সঙ্গে জামায়াতের জোট নিশ্চিত থাকলেও আওয়ামী লীগ ঠিক ততটা নিশ্চিন্ত নয় এরশাদকে নিয়ে। বাংলাদেশের রাজনীতির 'আনপ্রেডিক্টেবল' হিসেবে পরিচিত সাবেক এই রাষ্ট্রপতি যে কোনো দিকেই ঝুঁকতে পারেন।
তাই বর্তমান মিত্রদের ধরে রেখে পুনরায় জোট সংগঠিত ও সক্রিয় করার উদ্যোগ নিয়েছে আওয়ামী লীগ। জোটের বাইরে তারা ছোট ছোট রাজনৈতিক দলের সঙ্গেও সম্পর্ক বাড়ানোর চেষ্টা করছে। এরই অংশ হিসেবে আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য ওবায়দুল কাদের ১৪ দলীয় জোটের বেশ কয়েকটি দলের সঙ্গে কথা বলেছেন। এছাড়া গত মঙ্গলবার আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক আফজাল হোসেন বিকল্পধারার একটি অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করে বি চৌধুরীর সঙ্গে দেখা করেন। গত বৃহস্পতিবার আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ওবায়দুল কাদের এবং সাংগঠনিক সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের প্রধান বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর সঙ্গে বৈঠক করেন।
এ ব্যাপারে ওবায়দুল কাদের যায়যায়দিনকে বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে তিনি কয়েকটি দলের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) ও কাদের সিদ্দিকীর কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সঙ্গে তার আলাপ হয়েছে এবং বি চৌধুরীর বিকল্পধারা ও কর্নেল (অব.) অলি আহমদের এলডিপির সঙ্গেও যোগাযোগ চলছে।
এই উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে ওবায়দুল কাদের জানান, তাদের কিছু চ্যালেঞ্জিং বিষয় এসে গেছে। তারা আসলে প্রতিকূল সময় অতিক্রম করছেন। তবে ক্রাইসিসকে অপরচুনিটিতে রূপান্তর করা যায়। ঐক্যকে আরো সুদৃঢ় এবং সমপ্রসারণ করেই তা করতে হবে। মূল ভিত্তি হবে, মিনিমাম পয়েন্টে ম্যাক্সিমাম ঐক্য। কৌশলগত ঐক্যের বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, একসঙ্গে কাজ করার জন্য কমন গ্লোরি রক্ষা এবং কমন ডেঞ্জার মোকাবেলার লক্ষ্যে কমন গ্রাউন্ড খুঁজতে হবে। তাই জোট সমপ্রসারণের চেষ্টার পাশাপাশি মহাজোটের শরিকদের ক্ষোভ-বিক্ষোভ দূর করারও উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
সিপিবির সাধারণ সম্পাদক মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম অবশ্য আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোটবদ্ধ হওয়ার সম্ভাবনা বাতিল করে দিয়েছেন। তার মতে, বর্তমানে দেশের রাজনীতি এমন এক পর্যায়ে পেঁৗছেছে যে, বিএনপির কাছাকাছি অবস্থান করছে আওয়ামী লীগ। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের পঞ্চম সংশোধনীর বেশ কিছু মৌলিক বিষয় আওয়ামী লীগ গ্রহণ করেছে। এছাড়া জেনারেল এরশাদের রাষ্ট্রধর্মের বিষয়টিও তারা গ্রহণ করেছে। সুতরাং সমমনা দল হিসেবে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি কীভাবে জোটবদ্ধ হতে পারে, সেই ব্যাপারে দল দুটির এখন গবেষণা ও চেষ্টা করা উচিত। অবশ্য একই সঙ্গে তিনি বলেন, জনগণের স্বার্থে বেশ কিছু ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ কিংবা বিএনপির রাজনৈতিক মিত্র হিসেবে সিপিবি কাজ করতে আগ্রহী হতে পারে।
জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি আ স ম আবদুর রব যায়যায়দিনকে জানান, বিএনপি-আওয়ামী লীগের অনেক নেতার সঙ্গেই টেলিফোনে কথা হয়। কিন্তু রাজনৈতিক জোট বা একসঙ্গে আন্দোলন করার মতো সময় এখনো আসেনি। যে নেতা যত কথাই বলুক, শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার পক্ষ থেকে কেউ কথা না বললে কিংবা তারা কাউকে না পাঠালে সেসব কথার কোনো গুরুত্ব নেই।
 http://www.jjdin.com/?view=details&type=single&pub_no=162&cat_id=1&menu_id=1&news_type_id=1&index=0 

No comments:

Post a Comment